Sunday, May 27, 2012

ইবাদতে মধ্যমপন্থা অবলম্বন


আয়েশা (রা:) হতে বর্নিত, একদা নবী (সা:) তাঁর নিকট গেলেন, তখন এক মহিলা তাঁর কাছে (বসে) ছিল। তিনি বললেন, “এটি কে?” আয়েশা (রা:) বললেন, ‘অমুক মহিলা, যে প্রচুর নামায পড়ে।’ তিনি বললেন, “থামো! তোমরা সাধ্যমত আমল কর। আল্লাহর কসম! আল্লাহ ক্লান্ত হন না, যতক্ষন না তোমরা ক্লান্ত হয়ে পড়।” আর সেই আমল তাঁর নিকট প্রিয়তম ছিল, যেটা তার আমলকারী লাগাতার ক’রে থাকে।১

* ’আল্লাহ ক্লান্ত হন না’ – এ কথার অর্থ এই যে, তিনি সওয়ার দিতে ক্লান্ত হন না। অর্থাৎ, তিনি তোমাদেরকে সওয়াব ও তোমাদের আমলের প্রতিদান দেওযা বন্ধ করেন না এবং তোমাদের সাথে ক্লান্তের মত ব্যবহার করেন না; যে পর্যন্ত না তোমরা নিজেরাই ক্লান্ত হয়ে আমল ত্যাগ করে বস। সুতরাং তোমাদের উচিত, তোমরা সেই আমল গ্রহণ করবে, যা একটানা করে যেতে সক্ষম হবে। যাতে তাঁর সওয়াব ও তাঁর অনুগ্রহ তোমাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন থাকে।

আনাস (রা:) বলেন যে, তিন ব্যক্তি নবী (সা:) এর স্ত্রীদের বাসায় এলেন। তাঁরা নবী (সা:) এর ইবাদত সম্পর্কে জিঞ্জাসা করলেন। অত:পর যখন তাঁদেরকে এর সংবাদ দেওয়া হল তখন তাঁরা যেন তা অল্প মনে করলেন এবং বললেন, ‘আমাদের সঙ্গে নবী (সা:) এর তুলনা কোথায়? তাঁর তো আগের ও পরের সমস্ত গোনাহ মোচন ক’রে দেওয়া হয়েছে। (সেহেতু আমাদের তাঁর চেয়ে বেশী ইবাদত করা প্রয়োজন)।’ সুতরাং তাঁদের মধ্যে একজন বললেন, ‘আমি সারা জীবন রাতভর নামায পড়ব।’ দ্বিতীয়জন বললেন, ‘আমি সারা জীবন রোযা রাখব, কখনো রোযা ছাড়ব না।’ তৃতীয়জন বললেন, ‘আমি নারী থেকে দূরে থাকব, জীবনভর বিয়েই করব না।’ অত:পর রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁদের নিকট এলেন এবং বললেন, “তোমরা এই এই কথা বলেছ? শোনো! আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের চেয়ে বেশী আল্লাহকে ভয় করি, তার ভয় অন্তরে তোমাদের চেয়ে বেশী রাখি। কিন্তু আমি (নফল) রোযা রাখ এবং রোযা ছেড়েও দিই, নামায পড়ি এবং নিদ্রাও যাই। আর নারীদের বিয়েও করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” ২

ইবরে মাসউদ (রা:) হতে বর্নিত, নবী (সা:) বলেন, “দ্বীনের ব্যাপারে নিজের পক্ষ থেকে কঠোরতা অবলম্বনকারীরা ধ্বংস হয়ে গেল। (অথবা ধ্বংস হোক।)” এ কথা তিনি তিনবার বললেন। ৩

আবূ হুরাইরাহ (রা:) হতে বর্নিত, নবী (সা:) বলেন, “নিশ্চয় দ্বীন সহজ। যে ব্যক্তি অহেতুক দ্বীনকে কঠিন বানাবে, তার উপর দ্বীন জয়ী হয়ে যাবে। (অর্থাৎ মানুষ পরাজিত হয়ে আমল ছেড়ে দিবে।) সুতরাং তোমরা সোজা পথে থাক এবং (ইবাদতে) মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর। তোমরা সুসংবাদ নাও। আর সকাল-সন্ধ্যা ও রাতের কিছু অংশ ইবাদত করার মাধ্যমে সাহায্য নাও।৪

বুখারীর অন্য এক বর্ননায় আছে, “তোমরা সরল পথে থাকো, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, সকাল-সন্ধ্যায় চল (ইবাদত কর) এবং রাতের কিছু অংশে। আর তোমরা মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই গন্তব্যস্থলে পৌছে যাবে।”
অর্থাৎ, অবসর সময়ে উদ্যমশীল মনে আল্লাহর ইবাদত কর; যে সময়ে ইবাদত ক’রে তৃপ্তি পাওয়া যায় এবং তা মনে ভারী বা বিরক্তিকর না হয়। আর তাহলেই অভীষ্টলাভ করতে পারবে। যেমন বুদ্ধিমান মুসাফির উক্ত সময়ে সফর করে এবং যথাসময়ে সে ও তার সওয়ারী বিশ্রাম গ্রহন করে। (না ধীরে চলে এবং না তাড়াহুড়া করে।) ফলে সে বিনা কষ্টে যথা সময়ে গন্তব্যস্হলে পৌঁছে যায়।
আনাস (রা:) হতে বর্নিত, একদা নবী (সা:) মসজিদে প্রবেশ করলেন। হঠাৎ দেখলেন যে, একটি দড়ি দুই স্তম্ভের মাঝে লম্বা ক’রে বাঁধা রয়েছে। তারপর তিনি বললেন, “এই দড়িটা কি (জন্য)”? লোকেরা বলল, ‘এটি যয়নাবের দড়ি। যখন তিনি (নামায পড়তে পড়তে) ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন এটার সঙ্গে ঝুলে যান।’ নবী (সা:) বললেন, “এটিকে খুলে ফেল। তোমাদের মধ্যে (যে নামায পড়বে) তার উচিত, সে যেন মনে স্ফূর্তি থাকাকালে নামায পড়ে। তারপর সে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়বে, তখন সে যেন শুয়ে যায়।৫

আয়েশা (রা:) হতে বর্নিত, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেন, যখন নামায পড়া অবস্থায় তোমাদের কারো তন্দ্রা আসবে, তখন তাকে ঘুমিয়ে যাওয়া উচিত, যতক্ষন না তার ঘুম চলে যাবে। কারন, তোমাদের কেউ যদি তন্দ্রা অবস্থায় নামায পড়ে, তাহলে সে অনুভব করতে পারবে না যে, সম্ভবত: সে ক্ষমা প্রার্থনা করতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে নিজেকে গালি দিচ্ছে।৬

আবূ আব্দুল্লাহ জাবের ইবনে সামুরাহ (রা:) বলেন যে, ‘আমি নবী (সা:) এর সঙ্গে নামায পড়তাম। সুতরাং তাঁর নামাযও মধ্যম হত এবং তাঁর খুৎবাও মধ্যম হত।’৭

আবু জুহাইফা অহ্ব ইবনে আবদুল্লাহ (রা:) বলেন যে, নবী (সা:) (হিজরতের পর মদীনায়) সালমান ও আবূ দার্দার মাঝে ভাতৃত্ব স্হাপন করলেন। অত:পর সালমান (একদিন তাঁর দ্বীনী ভাই) আবূ দার্দার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে (তাঁর বাড়ী) গেলেন। তিনি (আবূ দার্দার স্ত্রী) উম্মে দার্দাকে দেখলেন, তিনি মলিন কাপড় পরে আছেন। সুতরাং তিনি তাঁকে বললেন, ‘তোমার এ অবস্থা কেন?’ তিনি বললেন, ‘তোমার ভাই আবূ দার্দার দুনিয়ার কোন প্রয়োজন নেই।’ (ইতোমধ্যে) আবূ দার্দাও এসে গেলেন এবং তিনি তাঁর জন্য খাবার তৈরী করলেন। অত:পর তিনি তাঁকে বললেন, ‘তুমি খাও। কেননা আমি রোযা রেখেছি।’ তিনি বললেন, ‘যতক্ষন না তুমি খাবে আমি খাব না।’ সুতরাং আবূ দার্দাও (নফল রোযা ভেঙ্গে দিয়ে তাঁর সঙ্গে) খেলেন। অত:পর যখন রাত এল, তখন (শুরু রাতেই) আবূ দার্দা নফল নামায পড়তে গেলেন। সালমান তাঁকে বললেন, ‘(এখন) শুয়ে যাও।’ সুতরাং তিনি শুয়ে গেলেন। কিছুক্ষন পর আবার তিনি (বিছানা থেকে) উঠে নফল নামায পড়তে গেলেন। আবার সালমান বললেন, ‘শুয়ে যাও।’ অত:পর যখন রাতের শেষাংশ এসে পৌঁছাল, তখন তিনি বললেন, ‘এবার উঠ নফল নামায পড়।’ সুতরাং তাঁরা দু’জনে একত্রে নামায পড়লেন। অত:পর সালমান তাঁকে বললেন, ‘নিশ্চয় তোমার উপর তোমার প্রভুর অধিকার রয়েছে। তোমার প্রতি তোমার আত্মারও অধিকার আছে এবং তোমার প্রতি তোমার পরিবারেরও অধিকার রয়েছে। অতএব তুমি প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার প্রদান কর।’ অত:পর তিনি নবী (সা:) এর নিকট এসে তাঁকে সমস্ত ঘটনা শুনালেন। নবী (সা:) বললেন, “সালমান ঠিকই বলেছে।”৮

আবদুল্লাহ ইবনে আম্র ইবনে আ’স (রা:) বলেন, নবী (সা:) কে আমার ব্যাপারে সংবাদ দেওয়া হল যে, আমি বলছি, ‘আল্লাহর কসম! আমি যতদিন বেঁচে থাকর ততদিন দিনে রোযা রাখব এবং রাতে নফল নামায পড়ব।’ সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা:) আমাকে বললেন, “তুমি এ কথা বলছ?” আমি তাঁকে বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! নি:সন্দেহে আমি এ কথা বলেছি, আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান হোক।’ তিনি বললেন, “তুমি এর সাধ্য রাখ না। অতএব তুমি রোযা রাখ এবং (কখনো) ছেড়ে দাও। অনুরূপ (রাতের কিছু অংশে) ঘুমাও এবং (কিছু অংশে) নফল নামায পড় ও মাসে তিন দিন রোযা রাখ। কারন, নেকির প্রতিদান দশগুন রয়েছে। তোমার এ রোযা জীবনভর রোযা রাখার মতো হয়ে যাবে।” আমি বললাম আমি এর অধিক করার শক্তি রাখি।’ তিনি বললেন, “তাহলে তুমি একদিন রোযা রাখ আর দু’দিন রোযা ত্যাগ কর।” আমি বললাম, ‘আমি এর বেশী করার শক্তি রাখি।’ তিনি বললেন, “তাহলে একদিন রোযা রাখ, আর একদিন রোযা ছাড়। এ হল দাঊদ (আ:) এর রোযা। আর এ হল ভারসাম্যপূর্ন রোযা।”
অন্য এক বর্ননায় আছে যে, “এটা সর্বোত্তম রোযা।” কিন্তু আমি বললাম, ‘আমি এর চেয়ে বেশী (রোযা) রাখার ক্ষমতা রাখি।’ রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, “এর চেয়ে উত্তম রোযা আর নেই।” (আব্দুল্রাহ বলেন,) ‘যদি আমি রসূল (সা:) এর নির্দেশ অনুযায়ী (প্রত্যেক মাসে) তিন দিন রোযা রাখার পদ্ধতি গ্রহণ করতাম, তাহলে তা আমার নিকট আমার পরিবার ও সম্পদ অপেক্ষা প্রিয় হত।’
অন্য এক বর্ননায় আছে, (নবী (সা:) আমাকে বললেন,) “আমি কি এই সংবাদ পাইনি যে, তুমি দিনে রোযা রাখছ এবং রাতে নফল নামায পড়ছ?” আমি বললাম, ‘সম্পূর্ন সত্য, হে আল্রাহর রসূল!’ তিনি বললেন,”পুনারয় এ কাজ করো না। তুমি রোযাও রাখ এবং (কখনো) ছেড়েও দাও। নিদ্রাও যাও এবং নামাযও পড়। কারন তোমার উপর তোমার দেহের অধিকার আছে। তোমার উপর তোমার চক্ষুদ্বয়ের অধিকার আছে। তোমার জন্য প্রত্যেক মাসে তিন দিন রোযা রাখা যথেষ্ট। কেননা, প্রত্যেক নেকীর পরিবর্তে তোমার জন্য দশটি নেকী রয়েছে আর এটা জীবনভর রোযা রাখার মত।” কিন্তু আমি কঠোরতা অবলম্বন করলাম। যার ফলে আমার উপর কঠিন করে দেওয়া হল। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমি সামর্থ্য রাখি।’ তিনি বললেন, “তুমি আল্লাহর নবী দাউদ (আ:) এর রোযা রাখ এবং এর চেয়ে বেশী করো না।” আমি বললাম, ‘দাউদের রোযা কেমন ছিল?’ তিনি বললেন, “অর্ধেক জীবন।” অত:পর আব্দুল্লাহ বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর বলতেন, ‘হায়! যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সা:) এর অনুমতি গ্রহণ করতাম (তাহলে কতই না ভাল হত)!’
আর এক বর্ননায় আছে, (নবী (সা:) আমাকে বললেন,) “আমি সংবাদ পেয়েছি যে, তুমি সর্বদা রোযা রাখছ এবং প্রত্যহ রাতে কুরআন (খতম) পড়ছ।” আমি বললাম, ‘(সংবাদ) সত্যই, হে আল্লাহর রসূল! কিন্তু এতে আমার উদ্দেশ্য ভাল ছাড়া অন্য কিছু নয়।’ তিনি বললেন, “তুমি আল্লাহর নবী দাউদের রোযা রাখ। কারন, তিনি লোকের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ইবাদতগুযার ছিলেন। আর প্রত্যেক মাসে (একবার কুরআন খতম) পড়।” আমি বললাম, ‘হে আল্রাহর নবী! আমি এর অধিক করার শক্তি রাখি।’ তিনি বললেন, ”তাহলে তুমি কুড়ি দিনে (কুরআন খতম) পড়।” আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর নবী! আমি এর চেয়েও বেশী ক্ষমতা রাখি।’ তিনি বললেন, “তাহলে তুমি প্রত্যেক সাতদিনে (খতম) পড় এবং এর বেশী করো না (অর্থাৎ, এর চেয়ে কম সময়ে কুরআন খতম করো না।)” কিন্তু আমি কঠোরতা অবলম্বন করলাম। যার ফলে আমার উপর কঠিন করে দেওয়া হলো। আর নবী (সা:) আমাকে বলেছিলেন, “তুমি জান না, সম্ভবত: তোমার বয়স সুদীর্ঘ হবে।” আব্দুল্লাহ বলেন, সুতরাং আমি ঐ বয়সে পৌঁছে গেলাম, যার কথা নবী (সা:) আমাকে বলেছিলেন। অবশেষে আমি যখন বৃদ্ধ হয়ে গেলাম, তখন আমি আকাঙ্ক্ষা করলাম, হায়! যদি আমি আল্লাহর নবী (সা:) এর অনুমতি গ্রহণ করে নিতাম।
অন্য এক বর্ননায় আছে, (নবী (সা:) আমাকে বললেন,) “আর তোমার উপর তোমার সন্তানের অধিকার আছে….।”
অন্য এক বর্ননায় আছে, “তার কোন রোযা নেই (অর্থাৎ, রোযা বিফল যাবে) সে সর্বদা রোযা রাখে।” এ কথা তিনবার বললেন।
অন্য এক বর্ননায় আছে, “আল্লাহর নিকট প্রিয়তম রোযা হচ্ছে দাউদ (আ:) এর রোযা এবং আল্লাহর নিকট নামায হচ্ছে দাউদ (আ:) এর নামায। তিনি মধ্য রাতে শুতেন এবং তার তৃতীয় অংশে নামায পড়তেন এবং তার ষষ্ঠ অংশে ঘুমাতেন। তিনি একদিন রোযা রাখতেন এবং একদিন রোযা ছাড়তেন। আর যখন শত্রুর সামনা-সামনি হতেন তখন (রণভূমি হতে) পলায়ন করতেন না।”
আরও এক বর্ননায় আছে, (আব্দুল্লাহ বিন আম্র) বলেন, আমার পিতা আমার বিবাহ এক উচ্চ বংশের মহিলার সঙ্গে দিয়েছিলেন। তিনি পুত্রবধুর প্রতি খুবই লক্ষ্য রাখতেন। তিনি তাকে তার স্বামী সম্পর্কে জিজ্ঞাস করতেন। সে বলত, ‘এত ভাল লোক যে, সে কদাচ আমার বিছানায় পা রাখেনি এবং যখন থেকে আমি তার কাছে এসেছি, সে কোনদিন আবৃত জিনিস স্পর্শ করেনি (অর্থাৎ, মিলনের ইচ্ছাও ব্যক্ত করেনি।)’ যখন এই আচরন অতি লম্বা হয়ে গেল, তখন তিনি (আব্দুল্লাহর পিতা) এ কথা নবী (সা:) কে জানালেন। অত:পর তিনি বললেন, “তাকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বল।” সুতরাং পরবর্তীতে আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। অত:পর তিনি বললেন, “তুমি কিভাবে রোযা রাখ?” আমি বললাম, ‘প্রত্যেক দিন।’ তিনি বললেন, “কিভাবে কুরআন খতম কর?” আমি বললাম, ‘প্রত্যেক রাতে।’ অত:পর তিনি ঐ কথাগুলি বর্ননা করলেন, যা পূর্বে গত হয়েছে। তিনি (আব্দুল্লাহ ইবনে আমর) তাঁর পরিবারের কাউকে (কুরআনের) ঐ সপ্তম অংশ পড়ে শুনাতেন, যা তিনি (রাতের নফল নামাযে) পড়তেন। দিনের বেলায় তিনি পুন: পড়ে নিতেন, যেন এমন আছে যা এই দুটির মধ্যে একটিতে আছে।৯

রাসূলুল্লাহ (সা:) এর একজন কেরানী আবূ রিবযী হানযালাহ বিন রাবী’ উসইয়িদী (আ:) বলেন, একদা আবূ বকর (রা:) আমার সঙ্গে সাক্ষাত করে বললেন, ‘হে হানযালাহ! তুমি কেমন আছ?’ আমি বললাম, ‘হানযালাহ মুনাফিক হয়ে গেছে!’ তিনি (আশ্চর্য হয়ে) বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! এ কি কথা বলছ?’ আমি বললাম, ‘(কথা এই যে, যখন) আমরা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর নিকটি থাকি, তিনি আমাদের সামনে এমন   ভঙ্গিমায় জান্নাত ও জাহান্নামের আলোচনা করেন, যেন তা আমরা স্বচক্ষে দেখছি। অত:পন যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা:) এর নিকট থেকে বের হয়ে আসি, তখন স্ত্রী সন্তান-সন্ততি ও অন্যান্য (পার্থিব) কারবারে ব্যাস্ত হয়ে অনেক কিছু ভুলে যাই।’ আবূ বকর (রা:) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমাদেরও তো এই অবস্থা হয়।’ সুতরাং আমি ও আবূ বকর গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা:) এর খিদমতে হাজির হলাম। অত:পর আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! হানযালাহ মুনাফিক হয়ে গেছে।’ রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, “সে কি কথা?” আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমরা যখন আপনার নিকটে থাকি, তখন আপনি আমাদেরকে জান্নাত-জাহান্নামের কথা এমনভাবে শুনান; যেমন নাকি আমরা তা প্রত্যক্ষভাবে দেখছি। অত:পর আমরা যখন আপনার নিকট থেকে বের হয়ে যাই এবং স্ত্রী সন্তান-সন্ততি ও কারবারে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, তখন অনেক কথা ভুলে যাই। (এ কথা শুনে) রাসূলুল্লাহ (সা:) বললেন, “সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ আছে! যদি তোমরা সর্বদা এই অবস্থায় থাকতে, যে অবস্থায় তোমরা আমার নিকটে থাক এবং সর্বদা আল্লাহর স্মরনে মগ্ন থাকতে, তহলে ফিরিশতাগণ তোমাদের বিছানায় ও তোমাদের পথে তোমাদের সঙ্গে মুসাফাহা করতেন। কিন্তু ওহে হানযালাহ! (সর্বদা মানুষের এক অবস্থা থাকে না।) কিছু সময় (ইবাদতের জন্য) ও কিছু সময় (সাংসারিক কাজের জন্য)।” তিনি এ কথা তিনবার বললেন।১০

ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন, কোন এক সময় নবী (সা:) খুৎবাহ দিচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি দেখলেন যে, একটি লোক (রোদে) দাঁড়িয়ে আছে। অত:পর তিনি তাঁর সম্বন্ধে জিঞ্জাসা করলেন। লোকেরা বলল, ‘আবূ ইসরাঈল। ও নযর মেনেছে যে, ও রোদে দাঁড়িয়ে থাকবে, বসবে না, ছায়া গ্রহণ করবে না, কথা বলবে না এবং রোযা রাখবে।’ নবী (সা:) বললেন, “তোমরা ওকে আদেশ কর, ও যেন কথা বলে, ছায়া গ্রহণ করে, বসে এবং রোযা পুরা করে।১১

১। সহীহুল বুখারী ৪৩, ১১২২, ১১৫১, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৮৭, ৬৪৬১, ৬৪৬২, ৬৪৬৪. ৬৪৬৫. ৬৪৬৬. ৬৪৬৭, মুসলিম ৭৪১, ৭৮২, ৭৮৩, ৭৮৫, ১১৫৬, ২৮১৮, নাসারী ৭৬২, ১৬২৬, ১৬৪২, ১৬৫২, ২১৭৭, ২৩৪৭, ২৩৪৯, ২৩৫১, ৫০২৫, আবু দাউদ ১৩১৭, ১৩৬৮, ১৩৭০, ২৪৩৪,, ইবনু মাজাহ ১৭১০, ৪২৩৮, আহমাদ ২৩৫২৩, ২৩৬০৪, ২৩৬৪২, ২৩৬৬০, ৪২৪০৯, ২৫৬০০।
২। সহীহুল বুখারী ৫০৬৩,মুসলিম ১৪০১, নাসায়ী ৩২১৭, আহমাদ ১৩১২২, ১৩০১৬, ১৩৬৩১
৩। মুসলিম ২৬০৭, আবু দাউদ ৪৬০৮, আহমাদ ৩৬৪৭
৪। সহীহুল বুখারী ৩৯, ৫৬৭৩, ৬৪৬৩, মুসলিম ২৮১৬, নাসয়ী ৫০৩৪, ইবনু মাজাহ ৪২০১, আহমাদ ৭১৬২, ৭৪৩০, ৭৫৩৩, ২৭৪৭০
৫। সহীহুল বুখারী ১১৫০, মুসলিম ৭৮৪, নাসায়ী ১৬৪৩, আবূ দাউদ ১৩১২, ইবনু মাজাহ ১৩৭১, আহমাদ ১১৫৭৫, ১২৫০৪, ১২৭০৮, ১৩২৭৮
৬। সহীহুল বুখারী ২১২, মুসলিম ৪৮৬, তিরমিযী ৩৫৫. নাসায়ী ১৬২, আবু দাউদ ১৩১০, ইবনু মাজাহ ১৩৭০, আহমাদ ২৩৭৬৬, ২৫১৩৩, ২৫১৭১, ২৫৬৯৯, মওয়াত্তা মালেক-২২৫৯, দারেমী ১৩৮৩
৭। মুসলিম ৮৬৬, তিরমিযী ৫০৭, নাসায়ী ‍১৪১৫, ১৪১৭, ১৪১৮, ১৪৩৫, ১৫৮২, ১৫৮৩, ১৫৮৪, ১৬০০, ১৬০২, আবূ দাউদ ১০৯৩, ১০৯৪, ১১০১, ১২৯৩, ইবনু মাজাহ ১১০৬, ১১১৬, আহমাদ ২০৩০৬, ২০৩১৬, ম২০৩২২, ২০৩৩৫,দরেমী ১৫৫৭
৮। সহীহুল বুখারী ১৯৬৮, ৬১৩৯, তিরমিযী ২৪১৩
৯। সহীহুল বুখারী ১৯৯৭৬, ১১৩১, ১১৩২, ১১৫৩, ১৯৭৪, ১৯৭৫, ১৮৭৭, ১৯৭৮, ১৯৭৯, ১৯৮০, ৩৪১৮, ৩৪১৯, ৩৪২০, ৫০৫২, মুসলিম ১১৫৯, তিরমিযী ৭৭০, নাসায়ী ১৬৩০, ২৩৪৪, ২৩৮৮, ২৩৮৯, ২৩৯০, ২৩৯১. ২৩৯২, ২৩৯৩, ২৩৯৬, ২৩৯৪, ২৩৯৭, ২৩৯৯ আবূ দাউদ ১৩৮৮, ১৩৮৯, ১৩৯০, ১৩৯১, ১৪২৭, ২৪৪৮, ইবনু মাজাহ ১৩৪৬, ১৭১২, আহমাদ ৬৪৪১, ৬৪৫৫, ৬৪৮০, ৬৪৯১, ৬৭২১
১০। মুসলিম ২৭৫০, তিরমিযী ২৪৫২, ২৫১৪, ইবনু মাজাহ ৪২৩৯, আহমাদ ১৭১৫৭, ১৮৫৬৬
১১। সহীহুল বুখারী ৬৭০৪, আবূ দাউদ ৩৩০০, ইবনু মাজাহ ২১৩৬, মুওয়াত্তা মালেক-১০২৯

পুন্যের অসংখ্য পথ

১) আবূ যার (রাঃ) বলেন যে, আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল (সাঃ) কোন আমল সর্ব উওম?’ তিনি বলেন, “আল্লাহর প্রতি বিশাস স্থাপন করা ও তাঁর পথে জিহাদ করা’’। আমি বললাম, ‘কোন গোলাম (কৃতদাস) স্বাধীন করা সর্ব উওম?’ তিনি বললেন, “যে তাঁর মালিকের দৃষ্টিতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও অধিক মূল্যবান।” আমি বললাম, ‘যদি আমি এ সব (কাজ) করতে না পারি।’ তিনি বললেন, “তুমি কোন কারিগরের সহযোগিতা করবে অথবা অকারিগরের কাজ করে দেবে।” আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রসূল! আপনি বলুন, যদি আমি (এর) কিছু কাজে অক্ষম হই (তাহলে কি করব)? তিনি বললেন, “তুমি মানুষের উপর থেকে তোমার মন্দকে নিবৃও কর। তাহলে তা হবে তোমার পক্ষ থেকে তোমার নিজের জন্য সাদকাহস্বরূপ।” (সহীহুল বুখারী ২৫১৮ ও মুসলিম ৮৪)
২) আবূ যার (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “তোমাদের মধ্যে প্রত্যেকের প্রত্যেক (হারের) জোড়ের পক্ষ থেকে প্রাত্যহিক (প্রদেয়) সাদকাহ রয়েছে। সুতরাং প্রত্যেক তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ বলা) সাদকাহ, প্রত্যেক তাহমীদ (আলহামদু লিল্লাহ বলা) সাদকাহ এবং ভাল কাজের আদেশ প্রদান ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ। এ সব কাজের পরিবর্তে চাশতের দু’রাকআত নামায যথেষ্ট হবে।” (মুসলিম ৭২০, আবূ দাউদ ১২৮৫১২৮৬)

৩) ঐ আবূ যার (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “আমার উম্মতের ভালমন্দ কর্ম আমার কাছে পেশ করা হল। সুতরাং আমি তাদের ভাল কাজের মধ্যে ঐ কষ্টদায়ক জিনিসও পেলাম, যা রাস্তা থেকে সরানো হয়। আর তাদের মন্দ কর্মসমূহের তালিকায় ঐ কফও পেলাম, যার উপর মাটি চাপা দেওয়া হয়নি।” (মুসলিম ৫৫৩, ইবনু মাজাহ ৩৬৮৩)
*মাটি চাপা দেওয়ার কথা তিনি এই জন্য বলেছেন যে, সে যুগে মসজিদের মেঝে মাটিরই ছিল। বর্তমানে পাকা মেঝে কাপড় অথবা পানি দ্বারা পরিষ্কার করতে হবে।

৪) উক্ত বর্ণনাকারী থেকেই বর্ণিত, কিছু সাহাবা বললেন, “হে আল্লাহর রসূল! ধনীরাই তো বেশী নেকীর অধিকারী হয়ে গেল। তারা নামায পড়ছে যেমন আমরা নামায পড়ছি, তারা রোযা রাখছে যেমন আমরা রাখছি এবং (আমাদের চেয়ে তারা অতিরিক্ত কাজ এই করছে যে,) নিজেদের প্রয়োজন-অতিরিক্ত মাল থেকে তারা সাহকাহ করছে।” তিনি বললেন, “আল্লাহ কি তোমাদের জন্য সাদকাহ করার মত জিনিস দান করেননি? নিঃসন্দেহে প্রত্যেক তাসবীহ সাদকাহ, প্রত্যেক তাকবীর সাদকাহ, প্রত্যেক তাহলীল সাদকাহ, ভাল কাজ নির্দেশ দেওয়া সাদকাহ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা সাদকাহ এবং তোমাদের স্ত্রী-মিলন করাও সাদকাহ।”
সাহাবাগন বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ স্ত্রী-মিলন ক’রে নিজের যৌনক্ষুধা নিবারন করে, তবে এতেও কি তার পুন্য হবে?’ তিনি বললেন, “কি রায় তোমাদের, যদি কেউ অবৈধভাবে যৌন-মিলন করে, তাহলে কি তার পাপ হবে? (নিশ্চয়ই হবে।) অনুরূপ সে যদি বৈধভাবে (স্ত্রী-মিলন করে) নিজের কামক্ষুধা নিবারন করে, তাহলে তাতে তার পুন্য হবে।” (মুসলিম ১০০৬, আবূ দাউদ ১৫০৪,ইবনু মাজাহ ৯২৭)

৫) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন, “প্রতিদিন যাতে সূর্য উদয় হয় (অর্থাৎ প্রত্যেক দিন) মানুষের প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে একটি করে সাদকাহ রয়েছে। ( আর সাদকাহ শুধু মাল খরচ করাকেই বলে না ; বরং) দু’জন মানুষের মধ্যে তোমার মীমাংসা করে দেওয়াটা সাদকাহ, কোন মানুষকে নিজ সওয়ারীর উপর বসানো অথবা তার উপর তার সামান উঠিয়ে নিয়ে সাহায্য করাও সাদকাহ, ভাল কথা বলা সাদকাহ, নামাযের জন্য কৃত প্রত্যেক পদক্ষেপ সাদকাহ এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করাও সাদকাহ।”

৬) এটিকে ইমাম মুসলিম আয়েশা (রাঃ) থেকেও বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “ আদম সন্তানের মধ্যে প্রত্যেক মানুষকে ৩৬০ গ্রন্থির উপর সৃষ্টি করা হয়েছে। (আর প্রত্যেক গ্রন্থির পক্ষ থেকে প্রদেয় সাদকা রয়েছে।)
সুতরাং যে ব্যক্তি “আল্লাহু আকবার” বলল, ‘আল-হামদু লিল্লাহ’ বলল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলল, ‘সুবহানাল্লাহ’ বলল, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলল, মানুষ চলার রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা অথবা হাড় সরাল, কিম্বা ভাল কাজের আদেশ করল অথবা মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করল, (এবং সব মিলে ৩৬০ সংখ্যক পুণ্যকর্ম করল, সে ঐদিন এমন অবস্থায় সন্ধ্যা করল যে, সে নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে দূর করে নিল।” (সহীহুল বুখারী ২৯৮৯,২৭০৭ ও মুসলিম ৯০০৯)

৭) আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি সকাল অথবা সন্ধায় মসজিদে যায়, তার জন্য আল্লাহ মেহমানের উপকরণ প্রস্তুত করেন। যখনই সে সেখানে যায়, তখনই তার জন্য ঐ মেহমানের উপকরণ প্রস্তুত করা হয়।” (সহীহুল বুখারী ৬৬২ ও মুসলিম ৪৬৭,৬৬৯)

৮) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “হে মুসলিম নারীগন! কোন প্রতিবেশিনী যেন তার প্রতিবেশিনীর (উপঢৌকনকে) তুচ্ছ মনে না করে; যদিও তা ছাগলের পায়ের ক্ষুর হক না কেন। (সহীহুল বুখারী ২৫৬৬ ও মুসলিম ১০৩০)

৯) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “ঈমানের সওর অথবা ষাটের বেশী শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সর্ব উওম (শাখা) ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা এবং সর্বনিম্ন (শাখা) রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস (পাথর, কাঁটা ইত্যাদি) দূরীভূত করা। আর লজ্জা ইমানের একটি শাখা।” (সহীহুল বুখারী ৯ ও মুসলিম ৩৫)

১০) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “একদা এক ব্যক্তি পথ চলছিল। তার খুবই পিপাসা লাগল। অতঃপর সে একটি কূপ পেল। সুতরাং সে তাতে নেমে পানি পান করল। অতঃপর বের হয়ে দেখতে পেল যে , (ওখানেই) একটি কুকুর পিপাসার জ্বালায় জিভ বের করে হাঁপাছে ও কাদা চাটছে। লোকটি (মনে মনে) বলল, ‘পিপাসাহর তাড়নায় আমি যে পর্যায় পৌছেছিলাম, কুকুরটিও সেই পর্যায় পৌছেছে।’ অতএব সে কূপে নামল তারপর তার চামড়ার মোজায় পানি ভর্তি করল। অতঃপর সে তা মুখে ধরে উপরে উঠল এবং কুকুরটিকে পানি পান করাল। আল্লাহ তাআলা তার এই আমল্কে কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।”
সাহাবাগন বললেন, “হে আল্লাহর রসূল ! চতুষ্পদ জন্তর প্রতি দয়া প্রদর্শনেও কি আমাদের সওয়াব হবে?’’ তিনি বললেন, “প্রত্যেক জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শনে নেকী রয়েছে।”
বুখারীর অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, “আল্লাহ তাআলা তার এই আমলকে কবুল করলেন। অতঃপর তাকে ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশ করালেন।”
বুখারী-মুসলিমের আর এক বর্ণনায় আছে, “ কোন এক সময় একটি কুকুর একটি কুপের চারিপাশে ঘোরা-ফিরা করছিল। পিপাসা তাকে মৃতপ্রায় করে তুলছিল। (এই অবস্থায়) হঠাৎ বনী ঈস্রাঈলের বেশ্যাদের মধ্যে এক বেশ্যা তাকে দেখতে পেল। অতঃপর সে তার চামড়ার মোজা খুলে তা হতে (কূপ হতে) পানি উঠিয়ে তাকে পান করাল। সুতরাং এই আমলের কারনে তাকে ক্ষমা করা হল।”  (সহীহুল বুখারী ২৩৬৩,১৭৪,২৪৬৬ ও মুসলিম ২২৪৪)

১১) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “ আমি এক ব্যক্তিকে জান্নাতে ঘোরাফেরা করতে দেখলাম। যে (পৃথিবীতে) রাস্তার মধ্যে হতে একটি গাছ কেটে সরিয়ে দিয়েছিল, যেটি মুসলমানদেরকে কষ্ট দিচ্ছিল।” (সহীহুল বুখারী ৬৫৪,৭২১,৬৫১ , মুসলিম ৪৩৭, ৪৩৯,১৯১৪ )
অন্য এক বর্ণনায় আছে, “এক ব্যক্তি রাস্তার উপর পড়ে থাকা একটি গাছের ডালের পাশ দিয়ে পার হল। সে বলল, “আল্লাহর কসম! আমি এটিকে মুসলিমের পথ থেকে অবশ্যই সরিয়ে দেব; যাতে তাদেরকে কষ্ট না দেয়। সুতরাং তাকে (এর কারনে) জান্নাতে প্রবেশ করানো হল।।”
বুখারী-মুসলিমের আর এক বর্ণনায় আছে, “একদা এক ব্যক্তি রাস্তায় চলছিল। সে রাস্তার উপর একটি কাঁটাদার ডাল দেখতে পেল। অতঃপর সে তা সরিয়ে দিল। আল্লাহ তাআলা তার এই আমলকে কবুল করলেন। এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন।”

১২) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে ওযু করল, অতঃপর জুম্মা পড়তে এল এবং মনোযোগ সহকারে খুতবাহ শুনল, সে ব্যক্তির এই জুম্মা ও (আগামী) জুম্মার মধ্যেকার এবং অতিরিক্ত আরো তিন দিনের (ছোট) পাপসমূহ মাফ করে দেয়া হল। আর যে ব্যক্তি (খুতবাহ চলাকালীন সময়ে) কাঁকর স্পর্শ করল, সে অনর্থক কর্ম করল।” ( অর্থাৎ, সে জুম্মার সওয়াব বরবাদ করে দিল)। (মুসলিম ৫৮৭, আবূ দাউদ ১০৫০,ইবনু মাজাহ ১০১০)

১৩) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন, “মুসলিম বা মু’মিন বান্দা যখন ওযূর উদ্দেশে তার মুখমণ্ডল ধৌত করে, তখন পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে প্রত্যেক সেই গোনাহ বের হয়ে যায়, যা সে দুই চক্ষুর দৃষ্টির মাধ্যমে করে ফেলেছিল। অতঃপর যখন সে তার হাত দুটিকে ধৌত করে, তখন পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে প্রত্যেক সেই গোনাহ বের হয়ে যায়, যা সে উভয় হাত দ্বারা ধারণ করার মাধ্যমে করে ফেলেছিল। অতঃপর যখন সে তার পা দুটিকে ধৌত করে, তখন পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে প্রত্যেক সেই গোনাহ বের হয়ে যায়, যা সে তার দু’পায়ের চলার মাধ্যমে করে ফেলেছিল। শেষ অবধি সমস্ত গোনাহ থেকে সে পবিত্র হয়ে বের হয়ে আসে।” (মুসলিম ২৪৪, তিরমীয ২)

১৪) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “পাঁচ ওয়াক্ত নামায, এক জুম্মা থেকে আর এক জুম্মা এবং এক রমযান থেকে আর এক রমযান পর্যন্ত (সংঘটিত সাগীরা গোনাহ) মুছে ফেলে; যদি কবীরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা যায় তাহলে ( নয়তুবা নয়)।” (মুসলিম ২৩৩, তিরমীয ২১৪)

১৫) উক্ত আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকেই বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “আমি কি তোমাদেরকে এমন কাজ বলে দেব না, যা দ্বারা আল্লাহ তাআলা পাপসমূহকে নিশ্চিহ্ন করে দেন এবং মর্যাদা বর্ধন করেন?” সাহাবাগন বললেন, ‘অবশ্যই বলুন, হে আল্লহর রসূল ! তিনই বললেন “ কষ্টের সময় পূর্ণরূপে ওযু করা, মসজিদের দিকে বেশি বেশি পদক্ষেপ করা ( অর্থাৎ দূর থেকে আসা) এবং এক নামাযের পর দ্বিতীয় নামাযের অপেক্ষা করা। সুতরাং এই হল (নেকী ও সওয়াব) সীমান্ত পাহারা দেওয়ার মত।” (মুসলিম ২৫১, তিরমীয ৫২)

১৬) আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি দুই ঠাণ্ডা (অর্থাৎ, ফজর ও আসরের) নামায পড়বে , সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
(সহীহুল বুখারী ৫৭৪, মুসলিম ৬৩৫)

১৭) উক্ত আবূ মূসা আশআরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “যখন বান্দা অসুস্থ হয় অথবা সফরে থাকে, তখন তার জন্য ঐ আমলের মতই (সওয়াব) লেখা হয়, যা সে গৃহে থেকে সুস্থ শরীরে সম্পাদন করত।” (সহীহুল বুখারী ২৯৯৬)

১৮) জাবের হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “প্রত্যেক নেকীর কাজ সাদকাহ স্বরূপ।” (সহীহুল বুখারী ৬০২১)

১৯) উক্ত জাবের হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “যে কোন মুসলিম কোন গাছ লাগায়, অতঃপর তা থেকে যতটা খাওয়া হয়, তা তার জন্য সাদকাহ হয়, তা থেকে যতটুকু চুরি হয়, তা তার জন্য সাদকাহ হয় এবং যে ব্যক্তি তার ক্ষতি করে, সেটাও তার জন্য সাদকাহ হয়ে যায়।” (মুসলিম ১৫৫২)

২০) মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, “মুসলিম যে গাছ লাগায় তা থেকে কোন মানুষ, কোন জন্তু এবং কোন পাখী যা কিছু খায়, তবে তা তার জন্য সাদকাহ হয়ে যায়।”  (সহীহুল বুখারী ২৩২০,মুসলিম ১৫৫২)

২১) উক্ত জাবের হতে বর্ণিত, যে বনু সালেমাহ মসজিদের নিকটে স্থান পরিবর্তন করার ইচ্ছা করল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর কাছে এই সংবাদ পৌছল। তিনি তাদেরকে বললেন, “আমি খবর পেয়েছি যে, তোমরা স্থান পরিবর্তন করে মসজিদের নিকট আসার ইচ্ছা করছ?” তারা বলল, ‘হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) ! আমরা এর ইচ্ছা করেছি।’ তিনি বললেন, “হে  বনু সালেমাহ! তোমরা তোমাদের (বর্তমান) গৃহেই থাকো; তোমাদের পদচিহ্নসমূহ লেখা হবে। তোমরা আপন গৃহেই থাকো; তোমাদের পদচিহ্নসমূহ লেখা হবে।” (মুসলিম) অন্য এক বর্ণনায় আছে, “ নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেক পদক্ষেপের বিনিময়ে একটি মর্যাদা বৃদ্ধি হবে।” (মুসলিম ৬৬৫)

২২) আবুল মুনযির উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, একটি লোক ছিল। আমি জানি না যে, অন্য কারো বাড়ি তার বাড়ির চেয়ে দূরে ছিল। তা সত্ত্বেও তার কোন নামায ছুটত না। অতঃপর তাকে বলা হল অথবা আমি (কা’ব) তাকে বললাম যে, ‘তুমি যদি একটি গাধা কিনে আঁধারে ও ভীষন রোদে তার উপর সওয়ার হয়ে আসতে, (তাহলে তা তোমার পক্ষে ভাল হত?)’ সে বলল, ‘আমি এটা পছন্দ করি না যে, আমার বাড়ি মসজিদ সংলগ্ন হোক! কারন আমি তো এই চাই যে, (দূর থেকে) আমার পায়ে হেঁটে মসজিদে যাওয়া এবং ওখান থেকেই পুনরায় বাড়ি ফিরা, সব কিছু যেন আমার নেকীর খাতায় লেখা যায়।’ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) (তার কথা শুনে) বললেন, “আল্লাহ তাআলা এ সমস্ত তোমার জন্য একএ করে দিয়েছেন।”

২৩) অন্য এক বর্ণনায় আছে, “নিশ্চয় তোমার জন্য সেই সওয়াবই রয়েছে, যার তুমি আশা করেছ।”(মুসলিম ৬৬৩, আবূ দাউদ ৫৫৭)

২৪) আবূ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ বিন ইবনে আমর ইবনে আ’স (রাঃ) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “চল্লিশটি সৎকর্ম আছে তার মধ্যে উচ্চতম হল, দুধ পানের জন্য (কোন দরিদ্রকে) ছাগল সাময়িকভাবে দান করা। যে কোন আমলকারী এর মধ্যে হতে যে কোন একটি সৎকর্মের উপর প্রতিদানের আশা করে ও তার প্রতিশ্রত পুরস্কারকে সত্য জেনে আমল করবে, তাকে আল্লাহ তার বিনিময়ে জান্নাত প্রবেশ করাবেন।” (সহীহুল বুখারী ৬৬৩১)

২৫) আদী ইবনে হাতেম (রাঃ) বলেন, আমি নবী (সাঃ)-কে বলতে শুনেছি, “তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো ; যদিও খেজুরের এক টুকরাও সাদকাহ করে হয়। আর যে ব্যক্তি এর সামর্থ্য রাখে না, সে যেন ভাল কথা বলে বাঁচে।”(সহীহুল বুখারী ৬০২৩,১৪১৩)

২৬) আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ঐ বান্দার প্রতি সন্তষ্ট হন, যে খাবার খায়, অতঃপর তার উপর আল্লাহর প্রশংসা করে অথবা পানি পান করে, অতঃপর তার উপর আল্লাহর প্রশংসা করে।” (মুসলিম ২৭৩৪)

২৭) আবূ মূসা (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “প্রত্যেক মুসলমানের উপর সাদকাহ করা জরুরী।” আবূ মূসা (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘যদি সে সাদকাহ করার মত কিছু না পায় তাহলে?’ তিনি বললেন, “সে তার হাত দ্বারা কাজ করে (পয়সা উপার্জন করবে) অতঃপর তা থেকে সে নিজে উপকৃত হবে এবং সাদকাও করবে।” পুনরায় আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, ‘যদি সে তাও না পারে?’ তিনি বললেন, “যে কোন অভাবী বিপন্ন মানুষের সাহায্য করবে।”
আবূ মূসা (রাঃ) বললেন, ‘যদি সে তাও না পারে?’ তিনি বললেন, “সে (অপরের) ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকবে। [কারন, সেটাও হল সাদকাহ সরূপ।]” (সহীহুল বুখারী ১৪৪৫,৬০২২)

Wednesday, May 23, 2012

এক জান্নাতী সাহাবীর আমল

হযরত আনাস ইবনে মালেক (রাঃ) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে (মসজিদে নববীতে) উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তিনি বললেন, তোমাদের নিকট এখন একজন জান্নাতী মানুষ আগমন করবে। (বর্ণনাকারী বলেন) অতপর একজন সাহাবী আগমন করলেন। তাঁর দাড়ি থেকে সদ্যকৃত অযুর পানির ফোটা ঝরে পড়ছিল। তিনি তার বাম হাতে জুতা নিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন।
তার পরদিনও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে অনুরূপ কথা বললেন এবং প্রথমদিনের মতো সেই সাহাবী আগমন করলেন।
যখন তৃতীয় দিন হল, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই কথা আবার বললেন এবং যথারীতি সেই সাহাবী পূর্বের অবস্থায় আগমন করলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আলোচনা শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন তখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ (রাঃ) সেই সাহাবীর অনুগামী হলেন। তিনি তাকে বললেন, আমি আমার পিতার সাথে ঝগড়া করে শপথ করেছি, তিনদিন পর্যন্ত তার ঘরে যাব না। এই তিনদিন আমাকে যদি আপনার ঘরে থাকার সুযোগ করে দিতেন, তবে আমি সেখানে থাকতাম। তিনি বললেন, হ্যাঁ, থাকতে পার।
বর্ণনাকারী হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলতেন, তিনি তার সাথে সেখানে সেই তিন রাত অতিবাহিত করলেন। তিনি তাঁকে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামায পড়তেও দেখলেন না। তবে তিনি যখন ঘুমাতেন, বিছানায় পার্শ্ব পরিবর্তন করতেন তখন আল্লাহর যিকির করতেন। হযরত আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, তার মুখ থেকে কিন্তু ভালো কথা ছাড়া কোনো মন্দ কথা শুনিনি। যখন তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেল এবং তার আমলকে সাধারণ ও মামুলি মনে করতে লাগলাম, তখন তাকে বললাম, হে আল্লাহর বান্দা! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আপনার সম্পর্কে তিনবার একথা বলতে শুনেছি যে, এখনই তোমাদের নিকট একজন জান্নাতী মানুষ আগমন করবে। উক্ত তিনবারই আপনি আগমন করেছেন। তাই আমি ইচ্ছা করেছিলাম আপনি কী আমল করেন তা দেখতে আপনার নিকট থাকব। যাতে আমিও তা করতে পারি। আপনাকে তো বেশি আমল করতে দেখিনি। তাহলে কোন গুণ আপনাকে এই মহান মর্যাদায় উপনীত করেছে, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন?
তিনি বললেন, তুমি যা দেখেছ, ঐ অতটুকুই। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, যখন আমি ফিরে আসছিলাম তখন তিনি আমাকে ডাকলেন। তারপর বললেন, আমার আমল বলতে ঐ অতটুকুই, যা তুমি দেখেছ। তবে আমি আমার অন্তরে কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না এবং আল্লাহ তাআলা কাউকে কোনো নেয়ামত দান করলে সেজন্য তার প্রতি হিংসা রাখি না।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, এ গুণই আপনাকে এত বড় মর্যাদায় উপনীত করেছে। আর সেটাই আমরা করতে পারি না।

{মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১৯১৮; আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া ৮/৭৪; আততারগীব ওয়াত তারহীব ৫/১৭৮}

হাদীসের কিছু ফাওয়ায়েদ
উক্ত হাদীসে আগন্তুক জান্নাতী সাহাবীর নাম অনুচ্চারিত হলেও তিনি হলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ), যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবীর একজন। এখানে তার ফযীলত ও অনন্য মর্যাদার পাশাপাশি তার বিশেষ একটি গুণ ও অনুপম স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের কথা আলোচনা করা হয়েছে।
উক্ত হাদীসটিতে মুসনাদে আহমদের বর্ণনায় আগন্তুক সাহাবীকে ‘একজন আনছারী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে তা পরবর্তী কোনো বর্ণনাকারীর ভুল। কারণ অন্যান্য বর্ণনাসূত্রে স্পষ্টভাবেই হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রাঃ)-এর নাম উল্লেখ রয়েছে।
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের সম্মুখে এক জান্নাতী সাহাবীর কথা বলে নেক্কার মানুষের প্রশংসার মাধ্যমে সৎকর্ম ও উত্তম আচরণের প্রতি জোর তাকীদ দিয়েছেন এবং তাদেরকে সেই মহৎ স্বভাব ও বিশেষ গুণ অর্জন করার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।

মুমিনদের করণীয় হলো : মুত্তাকী ও নেক্কার লোকদের আমল আগ্রহ ও মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করা এবং অনুসরণ-অনুকরণের নিমিত্তে সেই গুণ অর্জন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা। প্রয়োজনে তাদের নিকট অবস্থান করে তাদের সান্নিধ্য গ্রহণ করা। যেমন আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, (তরজমা) তারা ছিলেন এমন লোক যাদেরকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেছেন। সুতরাং তুমিও তাদের পথের অনুসরণ করো।-সূরা আনআম : ৯০
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) এই প্রেরণা থেকেই ঐ সাহাবীর নিকট অবস্থান করেছেন।
আর হাদীসের সেই সুস্পষ্ট বক্তব্য,যা সহজেই বোধগম্য, জান্নাত লাভের অধিকারী নিষ্কলুষ আত্মার ফযীলত। আত্মশুদ্ধি করা, অন্তরকে পাক-পবিত্র রাখা এবং হিংসা-বিদ্বেষ ও অন্যান্য আত্মার ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখা হচ্ছে এমন একটি গুণ, যা মানুষকে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতার শীর্ষ চূড়ায় নিয়ে যায়, তথা জান্নাত লাভের উপযোগী বানায়। কারণ, মানুষের অন্তর হল ঈমান-ইখলাস ও তাক্বওয়ার স্থান। সুতরাং কোনো খাঁটি মুমিনের অন্তরে ঈমান-তাক্বওয়া ও হিংসা-বিদ্বেষ কখনো একত্র হতে পারে না। এ জন্যই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আনাস (রাঃ) কে বলেছেন, হে বৎস! কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা ব্যতীত তুমি যদি সকাল-সন্ধ্যা অতিবাহিত করতে (জীবন কাটাতে) সক্ষম হও, তাহলে তাই করো।
হিংসা-বিদ্বেষ হল ঈমান-ইসলামের পরিপন্থী এমন অসৎ প্রবণতা, যা মানুষের নেকীকে ধ্বংস করে এবং জান্নাতের পথ হতে দূরে সরিয়ে দেয়। তাছাড়া হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, মানুষ যতক্ষণ হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকবে ততক্ষণ তারা কল্যাণের উপর অবিচল থাকবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পবিত্র হৃদয় দান করুন। আমীন।

Sunday, May 20, 2012

মাজারে গিয়ে দোয়া

অনেক ভাই বলে থাকেন, মাজারে গিয়ে দোয়া করলে শিরক হয় না কারণ, আমরা তো আল্লাহ্‌র কাছেই দোয়া করছি।

তাদের উত্তরে বলতে চাই, ধরুন আমি দুর্গা পূজা মন্ডপে গিয়ে সিজদা দিয়ে দোয়া করলাম তাহলেও তো শিরক হবে না, কারণ আমি তো আল্লাহ্‌র কাছেই দোয়া করছি।

যারা বলেন মাজারের বুজুর্গ ব্যক্তির অছীলায় আমাদের দোয়া তাড়াতাড়ি কবুল হবে, তাদের বলতে চাই, নবী (সা) এর চেয়ে সম্মানিত তো আর কেউ নেই তাহলে কেন তাঁর সাহাবীরা তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর কবরে গিয়ে দোয়া চাইলেননা ? তাঁর কবরকে কেন মাজার বানালেন না ?

অনেকে বলেন, কবর যিয়ারত করা সুন্নাত। এতে নিষেদ নাই। আমিও তাদের সাথে একমত। কিন্তু মাজার যিয়ারত আর কবর যিয়ারত কি এক ? নিজেদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করানোর জন্য কেউ কি মাজার যিয়ারত করে ? নাকি কিছু পাওয়ার আশায় মাজার যিয়ারত করে ? কিছু পাওয়ার আশা থাকলে মাজারে এসে দোয়া করা কেন শিরক হবে না ?

আমরা জানি এসব কথা লিখলে অনেক ভাই আমাদের গালাগালি করবেন। এটাই স্বাভাবিক। কারণ শয়তান চায় না মানুষ শিরকের পথ থেকে ফিরে আসুক। তবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য আমরা এসব লিখেই যাব।

সর্বশেষ একটি হাদিস-
রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তোমরা কবর যিয়ারত করো কারণ এটি তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
[নাসাঈ, ২০৩৮]

বৃষ্টি আমাদের জন্য বরকতময়

আল্লাহ্‌ তাআলা ইরশাদ করেন, "আর আকাশ হতে বর্ষণ করি বরকতপূর্ণ বারিধারা"  [সূরা ক্বাফ, আয়াত- ৯]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, দুই সময়ের দোয়া কখনও প্রত্যাখ্যাত হয় না, আযান শেষের পর এবং বৃষ্টির সময়। [হাকেম, ২/১১৪ আবূ দাঊদ, ২৫৪০]

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বৃষ্টি হলেই তাঁর দাসী কে বলতেন, আমার ঘোড়ার জিন এবং কাপড়-চোপড় বের করে বৃষ্টিতে দাও। (যেন রহমতের বৃষ্টি এর উপর পড়তে পারে) এবং তিনি উপরের (সূরা ক্বাফ, আয়াত-৯) আয়াতটি পাঠ করতেন। [আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ১২৪৫]

মেয়েকে বিয়ে দেয়ার আগে পিতা-মাতার জন্য তাদের মেয়ের সম্মতি গ্রহন

রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, কোন বিধবা নারী কে তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না এবং কোন কুমারী নারীকে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেয়া যাবে না। লোকেরা জিজ্ঞাসা করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা), কেমন করে তার অনুমতি নেব ? তিনি বললেন, তার চুপ করে থাকাটাই তার অনুমতি।  [বুখারী, ৪৭৬০]

অন্য এক হাদিসে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, নিশ্চই কুমারী মেয়েরা লজ্জাশীলা (হয়ত তারা মুখে সম্মতি দিতে লজ্জা পাবে)। তার চুপ করে থাকাটাই তার সম্মতি। [বুখারী, ৪৭৬১]

নারীকে বিবাহ করা

হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেনঃ "তিন গুণের যেকোনো একটি গুণের কারণে নারীকে বিবাহ করা হয়ঃ [১] ধন-সম্পদের কারণে [২] রূপ-সৌন্দর্যের কারণে ও [৩] দ্বীনদারির কারণে। তুমি দ্বীনদার ও চরিত্রবানকেই গ্রহণ কর।"

[মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৭৪৩৪ সহীহ ইবনে হিববান, হাদীস নং-৪০৩৪ মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-১১৭৬৫]